• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২২ পূর্বাহ্ন |
শিরোনাম :
সৈয়দপুরে চিপস কারখানার ৫০ হাজার টাকা জরিমানা নীলফামারীতে ছাই ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণের দায়ে অটো রাইস মিলের জরিমানা রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের পাচার সৈয়দপুর আর্মি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূঁজি বাজারে বিনিয়োগ বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড: ১০ দিন পর স্কুল শিক্ষিকার মরদেহ উদ্ধার জয়পুরহাটে জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত কারাগারে নেওয়ার সময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান: পুলিশ আহত মাদকের টাকার জন্য বাবাকে পিটিয়ে হত্যা, ছেলে পলাতক আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিল পুলিশ সদর দপ্তর দাঁড়িপাল্লার ছবি সরানোর উদ্যোগ, থাকছে নৌকা

শিশুসাহিত্য: জলভোজন

Vojon1434971306।। তাপস রায় ।। মেঘের আড়ালে সূর্যের লুকোচুরি আজ ক’দিন থেকেই। কুমড়ো ফুলের মতো হলুদ রোদ শেষ কবে আলো ছড়িয়েছে রূপক এখন আর মনে করতে পারে না। নীল আকাশে সাদা মেঘগুলো মুখ ভার করে উড়ছে এলোমেলো। যেন তাদের সমস্ত আয়োজনে জল ঢেলে দিয়েছে এই ভরা বর্ষাকাল।
আকাশে আরেক দল কালো মেঘ সুযোগ পেলেই তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে গুমোট সাদা মেঘগুলোকে। সেই সাদা মেঘের ফাঁক দিয়ে সূর্যের উঁকি দেওয়া দেখে রূপকের উৎসাহ বেড়ে যায় কয়েকগুণ।

কী, বলেছিলাম না, আর বৃষ্টি হবে না? ঐ দ্যাখ সূর্য উঠছে!
পিরু পাশেই ছিল। সে তাল মেলায়, আজ পূর্ণিমা। চাঁদের আলোয় জলভোজনটা জমবে ভালো।
জলভোজন আবার কী? শিপলু জানতে চায়।
বনে পিকনিক করলে বনভোজন। আর বর্ষায় নৌকায় পিকনিক করলে সে তো জলভোজনই হবে, না কি? পিরু বিষয়টা ব্যাখ্যা করেই সবাইকে তাড়া দেয়, নে এবার চল। এখনও অনেক কাজ বাকি।

কিন্তু চল বললেই তো আর হয় না। পরে চ্যালাকাঠের মার সামলাবে কে! নাকের ওপর পাওয়ারের চশমাটা ঠিক করতে করতে দোটানায় ভুগতে লাগল রিয়াল।
প্রস্তাব পাওয়ার পর থেকেই আনন্দে জল ভরা বেলুনের মতো উথাল-পাথাল করছে বুকের ভেতরটা। পরক্ষণেই গুড়গুড় মেঘের ডাকের মতো গুরুগম্ভীর বাবার কথা মনে হতেই রিয়ালের সব আনন্দ ফাটা বেলুনের মতো চুপসে যাচ্ছে- বাবা যদি অনুমতি না দেন। তারচেয়ে বড় কথা, বাবার সামনে দাঁড়িয়ে বলবে কে?
কেন আমি বলব, রূপক রিয়ালকে সাহস দেয়। আমরা সবাই মিলে বললে আঙ্কেল অবশ্যই রাজি হবেন। এক রাতেরই তো ব্যাপার। তাই না?
হুম। তাছাড়া কাল শুক্রবার। স্কুল বন্ধ। এমন সুযোগ আর আসবে না। পিরু যুক্তি দাঁড় করায়।

এখন এই যুক্তিগুলোই ওদের ভরসা। কিন্তু সমস্যা হলো শিপলুকে নিয়ে। কোনো যুক্তিতেই তাকে রাজি করানো যাচ্ছে না। সাঁতার না জানার কারণে সে কিছুতেই যাবে না। অথচ বন্ধুরাও নাছোড়বান্দা। শিপলুকে নিতেই হবে। নইলে গান গাইবে কে? এমন আয়োজনে গান-বাজনা হবে না তাই কী হয়?
শিপলু হইহই করে ওঠে, হয়, হয়, খুব হয়।
কচু হয়। তুই না গেলে আমিও যাব না। রিয়াল বেঁকে বসে।
পুরো আয়োজন ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম দেখে রূপক বিড়াল পায়ে দু’কদম শিপলুর দিকে এগিয়ে আসে। ইশারা পেয়ে পেছনে এসে দাঁড়ায় পিরু। চোখের পলকেই চ্যাংদোলা হয়ে যায় শিপলু। দোলনার মতো দুলতে দুলতে বন্ধুদের হাত থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য সে বৃথা চেষ্টা করতে থাকে।

এই ছাড়, ছাড়। ওরে বাবা! পড়ে যাব তো! শিপলু হাত-পা ছুড়তে থাকে।
কিন্তু কে শোনে সে কথা। অগত্যা শিপলুকে নিস্তার পেতে একবার নয়, দিব্যি দিয়ে চার বার বলতে হয়, যাব, যাব, যাব। টিকটিকির কসম কেটে বলছি, যাব।
টিকটিকির কসম আবার কী? পিরু জানতে চায়, সত্যি করে বল। নইলে ছাড়বো না।
শিপলু এবার অসহায় কণ্ঠে বলে, সত্যি বলছি যাব। নইলে টিকটিকির মতো আমার জিহ্বাও যেন খসে পড়ে।
ও এই তাহলে টিকটিকির কসমের আসল ব্যাপার। বলতে বলতে পিরু, রূপক শিপলুকে ছেড়ে দেয়। ছাড়া পেয়ে হাফ ছেড়ে বাঁচে শিপলু।

রূপকদের গ্রাম প্রতি বর্ষাতেই ডুবে যায়। এবার বর্ষা একটু তাড়াতাড়ি এসেছে। বৃষ্টিও হয়েছে বেশ। গ্রামের খেতে এখন বুক সমান বর্ষার জল। দূর থেকে গ্রামে ঢোকার রাস্তাটিকে হঠাৎ ভেসে ওঠা কুমিরের পিঠের মতো মনে হয়। সূর্যের ঝিকিমিকি রোদ সেই কাঁদা রাস্তায় পিছলে যায়।
রাস্তার গা ঘেঁষে মিত্তির বাড়ির খাল, নিচু বাড়ির উঠান, ধানের জমি, খেলার মাঠ বর্ষার জলে একাকার। কোনো কিছুই আর আলাদা করা যায় না। খালের শেষ মাথায় বড় বিল। ওদিকটায় রূপকরা যাবে না- এ কথা অবশ্য শিপলু বন্ধুদের কাছ থেকে আদায় করে নিয়েছে।

সবকিছু গুছিয়ে বন্ধুরা সবাই যখন পিরুদের বাড়ির পেছনের ঘাটে একত্রিত হলো, ঘড়ির কাটায় তখন রাত আটটা। ইশারায় সবাইকে চুপচাপ নৌকায় উঠতে বলে পিরু নিঃশব্দে কদম গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা নৌকাটা খুলে ফেলল। তারপর এক ধাক্কায় নৌকা ঠেলে দিয়ে গুলুইয়ের ওপর লাফিয়ে উঠে বসে।
ছোট্ট নৌকা দুলে উঠতেই হইহই করে ওঠে সবাই। মাথার উপর পূর্ণিমার গোল চাঁদ। চারদিকে থইথই রূপালী জল। মৃদু হাওয়ায় কচুরিপানার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভাসছে পাভেলদের নৌকা।

রূপক ব্যস্ত হয়ে পড়ে রান্নার আয়োজনে। রাঁধুনী হিসেবে বন্ধুমহলে রূপকের সুনাম আছে। কিন্তু সহকারী হিসেবে রিয়াল একেবারেই অযোগ্য। কিন্তু ওই যে বলে না, বনভোজনে এসে কি কেউ পথ হারানোর ভয় করে। এখানেও ঠিক তাই। রসিকতা, খুঁনসুটি, খালি গলায় গান আর থালায় তাল ঠুকতে ঠুকতে রাত প্রায় দুপুর।
এদিকে পেটের মধ্যে পেঁচার ডাক। রান্নাও প্রায় শেষ। মেন্যু ভুনা খিচুড়ি, মুরগির মাংস আর ইলিশ মাছ ভাজি। নৌকার মাঝখানে গোল হয়ে খেতে বসল সবাই। খাওয়ার মাঝখানে শিপলুই প্রথম প্রসঙ্গটা তুলল।
এই, ইলিশের ঘ্রাণে ভূত এসে আবার অ্যাটাক করবে না তো?
ভূঁত এঁলে কিঁলিয়ে পেঁত্নী বাঁনাবো। রূপক এমনভাবে কথাটা বলল, সবাই না হেসে পারল না। জলের ঢেউয়ের সঙ্গে হাসির ঢেউ মিলে দুলে উঠল নৌকাটা। শিপলু একটু সাবধান হয়ে বসল।

ব্যাপারটা বুঝতে পেরে রূপক শিপলুর প্লেটে মুরগির একটা রান তুলে দিয়ে মুচকি হেসে বলল, এটা তুই খা। ভূত এলে দৌড়ে পালানোর সময় পায়ে বল পাবি।
শিপলু রূপকের এই খোঁচাটুকু গায়ে মাখল না। উল্টো মনে মনে খুশিই হলো। সবাইকে দেখিয়ে দ্রুতই সে মুখের মধ্যে চালান করে দিল আস্ত মাংসের টুকরোটা। কিন্তু শিপলুর হা করা মুখ ক্রমশ বড় হতে দেখে একটু অবাকই হলো সবাই।
এ কোথায় এসে পড়েছে তারা! ভরা বর্ষার এই চাঁদনী রাতে বালকদলের বিস্ময় আতঙ্কে রূপ নিতে খুব একটা সময় লাগল না।

একটু আগেও জোনাকীর দল তাদের সঙ্গ দিচ্ছিল, কখন তারা মিলিয়ে গেল খেয়াল করেনি কেউ। দূরে ঝিঁ ঝিঁ পোকার রেডিও’র মতো একটানা ঝিরঝির শব্দও আর শোনা যাচ্ছে না। চারপাশটা যে ভালো করে দেখবে সে উপায়ও নেই। সুযোগ বুঝে চাঁদও মুখ লুকিয়েছে। কালো মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়েছে রাত জাগা তারার দল।
টর্চের আলোয় সীমাবদ্ধ দৃষ্টিসীমায় কোথাও কোনো জনমানুষের চিহ্ন নেই। হৈ হুল্লোড়ে সবাই এতোটাই মজে ছিল যে, টেরই পায়নি খালের জলের মৃদু স্রোতের টানে ভাসতে ভাসতে নৌকা কখন বিলের মাঝে এসে পড়েছে। বিলের মাথায় নদীর মুখ। চোরা স্রোত নৌকাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সেদিকেই।

খাওয়া ভুলে দ্রুত বৈঠা হাতে তুলে নিল পিরু। নৌকার মুখ সোজা ঘুড়িয়ে দিলো বাড়ির দিকে।
লগি হাতে তাকে সাহায্যের জন্য উঠে দাঁড়াল রূপক। অথৈ জলে লগি মাটির নাগাল পেল না। চারপাশের অস্বাভাবিক নীরবতার সঙ্গে হঠাৎ করেই অজানা এক ভয় এসে চেপে বসল সবার মনে।
ভাগ্যিস শিপলু বুঝতে পেরেছিল, নইলে কী হতো কে জানে! আর ভাবতে পারে না রিয়াল। বেশি কিছু ভাবা এখন আর সম্ভবও নয়। যত দ্রুত সম্ভব ভালোয় ভালোয় এখন বাড়ি ফিরতে পারলেই রক্ষা।

নৌকার সামনে দাঁড়িয়ে টর্চের আলো ফেলে রূপক। চাঁদহীন জোৎস্নার আঁধার ভেদ করে আলো খুব একটা দূরে গিয়ে পৌঁছায় না। বর্ষায় রাতের প্রকৃতিই এমন- এই জোৎস্না, এই মেঘ। এই ফুটফুটে আলো, এই ঘুটঘুটে অন্ধকার।
মেঘের আড়ালে চাঁদ কখন লুকিয়েছে টের পায়নি কেউ। রূপকের টর্চের আলোয় পথ খুঁজে নেয় পিরু। পাগলা কুকুরের তাড়া খাওয়ার মতো ভয় এক সময় সবাইকে এনে আছড়ে ফেলে পিরুদের বাড়ির ঘাটে। অন্ধকারে ডুবে থাকা কদমের মূলে নৌকা ধাক্কা খেয়ে থামতেই বন্ধুদের মধ্যে শুরু হয় ডাঙ্গায় লাফিয়ে নামার প্রতিযোগিতা।

প্রতিযোগিতায় সবাই উৎরে গেলেও মহাতঙ্কে লাফ দিতে গিয়ে ঝপাৎ শব্দে জলে পড়ে যায় শিপলু।
আকস্মিক এ ঘটনায় ডাঙ্গায় দাঁড়িয়ে হো হো হেসে ওঠে সবাই। মনের মধ্যে গেড়ে বসা ভয় অনেকটাই দূর হয়ে গেছে ততক্ষণে।
কোমড় সমান জলে শিপলু হাসফাস করছে দেখে পিরু বৈঠা এগিয়ে দিয়ে বলে, নে ধর, উঠে আয়। এবার বুঝেছিস তো, জলভোজন কাকে বলে?
কথার উত্তর দেয় না শিপলু। ডাঙ্গায় দাঁড়িয়ে সে তখনও কাঁপছে। হঠাৎ পাওয়া ভয় নাকি আকস্মাৎ বর্ষার জলভোজনে তার এ অবস্থা ঠিক বোঝা যায় না। 

সংগৃহিত


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ